
বাংলাদেশে এত মেড ইন ইন্ডিয়া পোশাক কেন ?
বাংলাদেশে এত মেড ইন ইন্ডিয়া পোশাক কেন ? বাংলাদেশ বর্তমানে ২০২৫ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।দেশের গর্ব গার্মেন্টস শিল্প। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। অথচ, হতবাক করে -আমরা দেখি অনেক পোশাকের গায়ে লেখা থাকে Made in India।
বিশেষ করে, বাংলাদেশের লোকাল মার্কেটের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় – বেশির ভাগ পোশাকে made in india লেখা থাকে। এমনকি বাজারে গেলেও বিক্রেতা বলেন এটি ইন্ডিয়ার প্রোডাক্ট এই পণ্যটি ভালো হবে।
এখন প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশে যদি, এতো পোশাক তৈরি হয়। তাহলে আবার অন্য দেশ থেকে – যেমন ইন্ডিয়া থেকে পোশাক আমদানি করতে হয়। আসলেই কি ইন্ডিয়া থেকে পোশাক আমদানি করা প্রয়োজন নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ বা ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে।
এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করবো এর বাস্তব বাণিজ্যিক কারণ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা সম্পর্কে। কেন লেখা হয় “Made in India”? নিম্নে কিছু বাস্তবিক কারণ দেওয়া হলো, যা এই ঘটনা ব্যাখ্যা করে

Re-Export বা Third Party Export :
অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড যেমন Zara, H&M, Levi’s প্রভৃতি তাদের পোশাক বাংলাদেশে তৈরি করায়। কিন্তু তারা এসব পোশাক ভারতের বন্দর দিয়ে তৃতীয় দেশে রপ্তানি করে। ফলে, প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী, origin country হিসেবে India লেখা হয়।
উদাহরণ হিসেবে Zara-এর এক পোশাক সেলাই হয়েছে গাজীপুরে, কিন্তু রপ্তানি হয়েছে মুম্বাই পোর্ট দিয়ে তাই গায়ে লেখা থাকে Made in India ।
ভারতীয় ব্র্যান্ডের নিজস্ব রুলস :
ভারতের নিজস্ব ব্র্যান্ড যেমন Pantaloons, BIBA, Allen Solly – এরা অনেক সময় পোশাক বাংলাদেশে উৎপাদন করালেও “Made in India” ট্যাগ লাগায়। তাদের বক্তব্য – আমরা গ্লোবাল সাপ্লাই করি, কিন্তু ব্র্যান্ড India-based।
Label Changing in Transit :
কিছু Importer দেশে পণ্য পৌঁছার পর লেবেল বদলে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় হয়তো পোশাক বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরবর্তী গন্তব্যে ট্যাক্স সুবিধা, ব্র্যান্ডিং, বা নিয়মের ফাঁক exploite করতে গায়ে লেখা হয় ভিন্ন দেশের নাম। যেখানে ভারতের নাম বেশি লেখা হয়।
বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান ৫৪ বছর পর কে এগিয়ে?
Raw Material vs Final Product বিভ্রান্তি :

পোশাকে অনেক সময় লেখা থাকে – Fabric made in India, stitched in Bangladesh, Designed in India, made in Bangladesh। এতে India-র নাম বেশি জায়গা পায়, যদিও সেলাই ও শ্রম মূলত বাংলাদেশেই।
নকল ট্যাগ ও বাজার বিভ্রান্তি -দেশের কিছু বাজারে চাহিদা বাড়াতে বা দাম বেশি নিতে, ভারতীয় নামের ট্যাগ ব্যবহার করা হয়। যেমন Made in India লেখা দিয়ে ক্রেতার মনে বিদেশি পণ্যের ধারণা তৈরি করা হয়। এটি প্রতারণামূলক ব্যবসা, এবং বাংলাদেশের শ্রমিক ও কারখানার মূল্যায়ন হ্রাস করে।
মুলত কিছু অসাধু ব্যবসায়ি বাংলাদেশের পোশাকেই made in india লিখে বিক্রি করে। বাংলাদেশে এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে যেখানে, জনগণ ভাবে ইন্ডিয়ার প্রোডাক্ট মানে ভালো পণ্য। আর এই সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়িরা বাংলাদেশের পণ্যেই made in india লিখে দেয়।
এছাড়াও বাংলাদেশের জনগণের অনেকের ধারণা। বাংলাদেশের পোশাক সব বিদেশে চলে যায়। বাংলাদেশের মানুষ এসব দামি পোশাক কিনতে পারবে না। তাই অন্য দেশ থেকে সস্তাই পোশাক আমদানি করা হয়। এই ভাবনাটি কিছুটা সত্য হলেও পুরাপুরি সত্য নয়।

কারণ বাংলাদেশের লোকাল মার্কেটে যদি, কম দামের পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। আর সেই চাহিদা পুরনের জন্য, বিদেশ থেকে পোশাক আমদানি করতে হয়। তাহলে বাংলাদেশের ছোট ছোট পোশাক কোম্পানি গুলোও সেই চাহিদা পুরনের জন্য এগিয়ে আসতো। কারণ সিম্পল – চাহিদা থাকলে দেশের ব্যবসায়িরা সেই পণ্য তৈরি করবেই।
তাহলে কেন করে না। আসলে তারা করে কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই পোশাকের নাম হয়ে যায় made in india। কিন্তু একেবারেই যে অন্য দেশ থেকে পোশাক বাংলাদেশে আমদানি হয়না সেটা কিন্তু নই। আবার মনে রাখতে হবে দেশের পোষাক তৈরির বেশিরভাগ কাঁচামাল অন্য দেশ থেকে আনতে হয়।
এখন অতি সহজে বলতে গেলে – বাংলাদেশে মেড ইন ইন্ডিয়া পোশাক মূলত আসে, কারণ ভারতীয় পোশাকের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং দামের কারণে। ভারতীয় পোশাকের কিছু ডিজাইন, গুণমান এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বাংলাদেশের গ্রাহকদের মধ্যে জনপ্রিয়। এছাড়াও, কিছু ভারতীয় পোশাকের দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণেও এটি বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
আসলে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের চাহিদা অনেক বেশি এবং এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে, কিছু ক্ষেত্রে, ভারতীয় পোশাকের কিছু বিশেষত্ব এবং কম দামের কারণে কিছু মানুষ এটি পছন্দ করে।

এখন আর একটি প্রশ্ন থেকে যায়। এখানে কি কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রও রয়েছে? বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এটি কেবল ব্যবসার প্রশ্ন নয়, বরং একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনাও হতে পারে।
ভারতের কৌশল – বাংলাদেশকে শুধু সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে ভারত। যা কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজ তুলে ধরছে। আর এভাবেই বাংলাদেশের অর্জনকে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে ভারত।
শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকা -অনেকে মনে করেন, তৎকালিন শেখ হাসিনা সরকার – ভারতের প্রতি এতটাই নমনীয় ছিলো যে, এসব বিষয়ে কোনো কঠোর অবস্থান নিত না। এমনকি বাংলাদেশে অতিরিক্ত পোশাক তৈরি হবার পরেও ভারতের পোশাক আমদানি করতে হতো।
প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস রপ্তানির যে মর্যাদা বাংলাদেশের প্রাপ্য, তা চলে যাচ্ছে অন্য দেশের নামে – যা অর্থনীতি ও জাতীয় মর্যাদার জন্য ভয়ংকর। এসবের জন্য সবচেয়ে বড় দায় হলো গার্মেন্টস মালিক ও মিডিয়ার নীরবতা।
অনেক গার্মেন্টস মালিক ভারতের ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তিতে জড়িত। তারা চান না বিতর্ক তৈরি হোক। ফলে এই বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। আর এ বিষয়ে মিডিয়াও এক অজানা কারণে এড়িয়ে চলে।

এখন প্রশ্ন জাগে, যেখানে পোশাক তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের কারখানায়, যেখানে শ্রম দিচ্ছে আমাদের বাংলাদেশের মানুষ – সেখানে ভারতের নাম কেন ব্যবহার হবে। আর আমাদের বর্তমান সরকার কি এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিবে।
এখানে, শুধু ব্যবসা নয়, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প শুধু রপ্তানি আয় নয়, এটি একটি জাতির শ্রম, মেধা ও সম্মানের প্রতীক। সেখানে যদি অন্য দেশের নাম বসে, তাহলে সেটা শুধু ট্যাগ চুরি নয়, জাতিগত সম্মান হরণের শামিল। বর্তমান সরকার ও মিডিয়ার উচিত এবিষয়ে সতর্ক হওয়া।