
যশোর আধুনিক ঐতিহ্যের মেগা সিটি!
ভৈরব নদীর তীরে গড়ে ওঠা যশোর শহর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক জীবন্ত ক্যানভাস। ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাণিজ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে এই শহরটি আজও মুগ্ধ করে সবাইকে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শহরের মধ্যে একটি যশোর। নানা কারণে যশোর বিখ্যাত।
যশোর ফুলের রাজধানী হিসেবে বিখ্যাত। কেবল ফুলের সৌরভেই নয়, খেজুর গুড়ের মিষ্টি স্বাদ, মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যিক ঐতিহ্য আর বেনাপোল স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক গুরুত্বে দেশজুড়ে আলোচিত। সাথে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
চলুন, আজকের প্রতিবেদনে জেনে নিই, যশোরের গল্প -যা ইতিহাসের পাতা থেকে আধুনিক যুগের সম্ভাবনার দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। যা পরবর্তী বাংলাদেশের মেগাসিটি হতে চলেছে?
এশিয়া কাপ ২০২৫ সর্বশেষ আপডেট!

যশোর সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যও এর ইতিহাস সম্পর্কে আগে জানতে হবে। কারণ যশোরের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যশোরের ইতিহাস প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে জড়িত। টলেমির মানচিত্রে এ অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে পীর খান জাহান আলীর সময় থেকে যশোর নামের উৎপত্তি হয়, যার অর্থ আরবিতে ‘সাঁকো’।
বারো ভূঁইয়ার রাজা প্রতাপাদিত্যের শাসনামলে যশোর ছিল একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৭৮১ সালে ব্রিটিশরা যশোরকে জেলা ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যশোর দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখায়। যা যশোরের জন্য গৌরবের বিষয়।
যশোর মানেই গদখালি ফুলের হাট। বাংলাদেশের ৮০% ফুল এখান থেকে সরবরাহ হয়। গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধার সৌরভে মুখরিত এই বাজার পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়। শীত এলে যশোরের খেজুর গুড় আর রসের কথা মনে পড়ে। যশোরে প্রচুর খেজুরের রস ও গুড় পাওয়া যায়। প্রতি বছর প্রায় ৩৭,০০০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হয়, যা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
ফিলিস্তিন থেকে ভাইরাল সর্বশেষ নিউজ!

এদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবহৃত স্থল বন্দর এই যশোর জেলাতেই অবস্থিত। আর এই বন্দরের নাম বেনাপোল স্থল বন্দর। বেনাপোল স্থলবন্দর যশোরকে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছে। দেশের বৃহত্তম এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভুমিকা পালন করে। এছাড়া, চিংড়ি ও মাছ চাষ যশোরের অর্থনীতির আরেকটি শক্তিশালী স্তম্ভ।
এদিকে শিক্ষাক্ষেত্রেও যশোর অনেক উন্নত। সম্পুর্ণ খুলনা বিভাগের জন্য যে শিক্ষা বোর্ড আছে তা যশোরে অবস্থিত। এছাড়াও যশোরের জনগণের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য যশোরে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যার নাম যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাথে এখানে মেডিকেল কলেজও রয়েছে যা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার মান অনেক উন্নত করছে।
বিনোদনের জন্যও রয়েছে অনেক জায়গা। যা যশোরের জনগণের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যশোরের পর্যটন কেন্দ্র গুলি – চাঁচড়া শিবমন্দির, মধুপল্লী (মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান), ভরত রাজার দেউল ও জেস গার্ডেন পার্ক যশোরের পর্যটন সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। সাথে বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক আর যশোর বোট ক্লাব পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জনপ্রিয় স্থান। শীত ও বসন্তে পর্যটকদের ভিড়ে যশোর মুখরিত হয়ে ওঠে।

এছাড়াও খুলনা বিভাগের একমাত্র বাণিজ্যক বিমান বন্দর রয়েছে যশোরে। সেখানেও অনেক পর্যটক বেড়াতে যেতে পছন্দ করে। সাথে যশোরের সাথে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
যশোরে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাস, যা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি। এখান থেকে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সেনা সার্ভিস ও সহায়তা প্রদান করা হয়। শুধু সেনাবাহিনীই নয়, যশোরে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান বাহিনী ঘাঁটিও, যেখানে নিয়মিতভাবে পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই সামরিক স্থাপনাগুলো মিলিয়ে যশোর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ফুল ও চিংড়ি রপ্তানির পাশাপাশি আইটি শিল্পের বিকাশ যশোরকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। যশোর আইটি পার্ক যশোরের নতুন সম্ভবনার নাম। যেখানে ২০০০ হাজার বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পাঁচ তারকা হোটেল। জেলা স্টেডিয়াম – যেখানে তরুন প্রজন্ম খেলাধুলা করে থাকে। যারফলে বিভিন্ন নেশাদ্রব্য তারা থেকে দুরে থাকে।

কিন্তু এতকিছু থাকার পরেও যশোরের উন্নয়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নদী দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধীরগতি কিছুটা বাধা সৃষ্টি করছে। তবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এসব সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে ফুল ও আইটি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে যশোর বাংলাদেশের অর্থনীতির আরও শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
বাংলাদেশের যশোর শহর শুধু একটি শহর নয়, এটি ইতিহাসের গৌরব, সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর আধুনিক সম্ভাবনার এক মোহনা। মাইকেল মধুসূদনের কাব্য থেকে গদখালির ফুলের সৌরভ, খেজুর গুড়ের মিষ্টি স্বাদ থেকে বেনাপোলের বাণিজ্যিক গতি – যশোর সব মিলিয়ে একটি জীবন্ত শহর। এই শহরের গল্প যেন আরও সমৃদ্ধ হয়, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে।
তথ্যসূত্র :- স্থানীয় সংবাদপত্র, ঐতিহাসিক নথি ও যশোরের সাম্প্রতিক উন্নয়ন প্রতিবেদন সহ নিজস্ব বাস্তব সমৃদ্ধ জ্ঞান।